মহালয়া: দেবীপক্ষের সূচনা ও মায়ের আগমনী বার্তা

posted in: Uncategorized | 0
মহালয়ায় দেবী দুর্গার প্রতিমার চক্ষুদান

ভোর তখনও ফোটেনি, চারদিকে ঘন কুয়াশা, আর ঠিক তখনই বেতারে ভেসে আসে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর – “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা”। এই একটি মুহূর্তেই বাঙালির মনে জেগে ওঠে পুজোর ঘণ্টা। এই দিনটির নাম মহালয়া – দেবীপক্ষের সূচনা, আর মা দুর্গার আগমনী বার্তার প্রথম প্রহর। RNEPST-এর পক্ষ থেকে আজকের এই লেখা মহালয়ার সেই আবেগ আর ঐতিহ্যকে নিয়েই।

মহালয়া কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবীপক্ষের প্রথম দিন – এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণই হল মহালয়া। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই দিনেই দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসার প্রস্তুতি শুরু করেন, আর ঠিক এক সপ্তাহ পরেই শুরু হয় দুর্গাপুজোর মূল উৎসব। তাই মহালয়াকে বলা হয় পুজোর “কাউন্টডাউন” – এই দিন থেকেই বাতাসে বাজে সেই চেনা আগমনী সুর, আর মানুষের মনে শুরু হয়ে যায় উৎসবের প্রকৃত প্রতীক্ষা।

তর্পণ: পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা

মহালয়ার সকালে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ – হাতে জল, তিল আর কুশ নিয়ে করেন তর্পণ, পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য। এই আচার শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, এটি একটি গভীর আবেগেরও প্রকাশ – যাঁরা আজ নেই, তাঁদের স্মরণ করে, তাঁদের আশীর্বাদ নিয়েই যেন নতুন উৎসবের পথে পা বাড়ানো হয়। পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের শুরু – এই দুইয়ের মাঝে তর্পণ যেন এক সেতুবন্ধন।

মহিষাসুরমর্দিনী ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমর কণ্ঠ

মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত “মহিষাসুরমর্দিনী” অনুষ্ঠান ছাড়া বাঙালির এই দিনটি সম্পূর্ণ হয় না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে গাওয়া গান – এই অনুষ্ঠান দশকের পর দশক ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে ভোরবেলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। আজও, প্রযুক্তি যতই বদলে যাক, লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোর চারটেয় উঠে রেডিও বা মোবাইলে সেই একই রেকর্ডিং শোনেন – এ এক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলা আবেগের ধারা।

চক্ষুদান: দেবীর জাগরণ

মহালয়ার দিনেই কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা প্রতিমার চোখ আঁকেন – এই আচারকে বলা হয় চক্ষুদান। শিল্পীর তুলির শেষ টানেই প্রাণহীন মাটির মূর্তি যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত দেবী। এই মুহূর্তটি অত্যন্ত পবিত্র বলে মানা হয় – বিশ্বাস করা হয়, এখান থেকেই দেবী দুর্গা সত্যিকারের অর্থে জেগে ওঠেন, আর পুজোর প্রকৃত সূচনা হয়।

RNEPST-তে আমাদের মহালয়া

পূজা এবম সাংস্কৃতিক ট্রাস্টের পক্ষ থেকে প্রতি বছর রাজনগর এক্সটেনশনের প্রবাসী বাঙালি পরিবারগুলিকে নিয়ে আমরা মহালয়ার ভোরে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করি – মহিষাসুরমর্দিনী শোনা, আড্ডা আর একসাথে পুজোর প্রস্তুতির আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। দিল্লি-এনসিআরের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এই একটি সকাল আমাদের ফিরিয়ে দেয় শিকড়ের কাছে, পরিবারের কাছে, বাংলার কাছে।

তাই এই মহালয়ায়, আসুন আমরা সবাই মিলে সেই আগমনী সুরে গলা মেলাই, পূর্বপুরুষদের স্মরণ করি, আর মায়ের আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনি।

শুভ মহালয়া। জয় মা দুর্গা!

Comments are closed.